কালের রথের চাকা অবিরত ঘুরছে. কালের যাত্রার ধ্বনি কেউ হয়তো শুনছে বা কারো সে দিকে ভ্রূক্ষেপ নেই. সময়ের রফিক স্যার স্রোতে নতুন ইতিহাসের জন্ম হচ্ছে, কোন ইতিহাস নতুন দীপ্তিতে উজ্জ্বল হয়ে প্রেরণা দিচ্ছে, কোনটি মুছে যাচ্ছে, কিংবা মুছে ফেলা হচ্ছে. সময়ের আবর্তনে প্রত্যেকটা বছরের ফেব্রুয়ারি মাসটা বাঙালির কাছে অন্যরকম আবেদন নিয়ে হাজির হয়. এই একটা মাস এলেই সুপ্তিমগ্ন জাতি হঠাৎ খানিকটা সম্বিত প্রাপ্ত হয়ে ভাষা বিকৃতির জন্য কুম্ভীরাশ্রু বিসর্জন করে. সর্বোপরি ভাষা প্রতিযোগ, অনুযোগ, ভাষা প্রীতিজনিত আধিখ্যেতা, লেখক প্রকাশকদের বইমেলা উপলক্ষে তৎপরতা আর উদযাপনের বাগাড়ম্বতা বুঝিয়ে দেয় মাসটা ফেব্রুয়ারি. তারপর আবার বিগত দুই দশক যাবত সাড়ম্বরে ভ্যালেন্টাইন্স ডে উদযাপন ফেব্রুয়ারির ব্যাতিক্রমী মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে. দিবসখানা এলেই তরুণ-তরুণীর প্রেমের ফল্গুধারা দামিনী বেগে ধাবিত হয়, সদ্যোজাত শিশুও বোধ করি প্রচার যন্ত্রের কল্যাণে তারিখটা অন্তরে-মস্তিষ্কে প্রোথিত করে নেয়. প্রয়াত বরেণ্য লেখক হুমায়ুন আজাদ বলেছিলেন "" বাঙালি আন্দোলন করে, সাধারণত ব্যর্থ হয়, কখনো কখনো সফল হয়; এবং সফল হওয়ার পর মনে থাকে না কেনো তারা আন্দোলন করেছিলো "." উক্তিটির অবতারণার কারণ 14 ই ফেব্রুয়ারি কিংবা ভালোবাসা দিবস সম্পর্কে লিখতে গিয়ে এর চেয়ে ভালো কোন উদ্ধৃতি দেয়া অসম্ভব.
আত্মবিস্মৃত জাতির চেতনার মর্মমূলে অনেকেই বারে বারে আঘাত হেনেছেন, জানি না কতটুকু সফল হয়েছেন, সফল হলে বোধ করি আমাকে লিখতে হত না. ইতিহাসের পাতা ওল্টাই.ফিরে যাই স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের সেই অগ্নিঝরা দিনগুলোতে. বিনা রক্তপাতে সামরিক অভ্যুথানের মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণকারী জেনারেল এরশাদের সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল বাংলার সংশপ্তক ছাত্রসমাজ.মজিদ খান প্রণীত বৈষম্যমূলক ও বাণিজ্যিকীকরণের শিক্ষানীতি প্রত্যাখ্যান করে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ধর্মঘট ও মিছিলের ডাক দেয়. সেই মিছিলে এরশাদের পেটোয়া পুলিশ বাহিনী হামলা চালায়. বেয়নট দিয়ে খুচিয়ে হত্যা করে ছাত্রনেতা জয়নালকে, গুলিতে নিহত হয় কাঞ্চন, প্রাণ হারায় দীপালি সাহা নামে এক অবুঝ শিশুর. সেই দিন এরশাদ নিজের অজান্তে বারুদে আগুন দিয়েছিল, আর সেই বিদ্রোহের আগুন দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়েছিল জাতির সমস্ত চেতনায়. জয়নাল-কাঞ্চনদের দেখানো পথে হেঁটেছিলেন নূর হোসেন, ডাঃ মিলন সহ নাম না জানা আরো অনেকে.আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় এরশাদ ক্ষমতাচ্যুত হয়, গণতন্ত্রের পতাকা শহীদের রক্তে স্নাত হয়ে আবার উড্ডীন হয়. স্বাধীনতা পরবর্তী এই বৃহৎ আন্দোলন সংগ্রামের উদবোধন লগ্ন ছিল ফেব্রুয়ারি মাসের একটা তারিখ. 14 ই ফেব্রুয়ারি.ছাত্রজনতার প্রথম প্রতিবা্দ, প্রথম বিক্ষোভে ফেটে পড়া, প্রথম আত্মদান, সামরিক বেষ্টনী থেকে গণতন্ত্রকে মুক্ত করার জন্য.কিন্তু হায়! বিশ্ববেহায়ার আরশ কাঁপানো সেই শহীদী আত্মদান ভ্যালেন্টাইন্স ডে "র আড়ালে চাপা পড়ে গেছে অনেকটা নিঃশব্দে.ধুর্ত শেয়াল এরশাদ অবৈধ ক্ষমতাকে জনগণের কাছে জায়েজ করার জন্য অনেক কুকর্ম করেছিলেন. যেমনি ভাবে ইসলামকে বানিয়েছিলেন রাষ্ট্রধর্ম. নিজের ললাট থেকে অমোচনীয় কলঙ্ক তিলক মুছে ফেলার জন্য সুযোগ খুঁজতে থাকা এরশাদের সাথে হাত মেলালেন বুদ্ধিজীবীর লেবাস ধারণকারী তারই মত আরো এক খচ্চর প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত নপুংসক শফিক রেহমান.রেহমান সাহেব আমদানি করলেন বিশ্ব ভালোবাসা দিবস.প্রেমের জোয়ারে ভাসিয়ে দিলেন বাংলার নগর-বন্দর, গ্রাম-গঞ্জ .ধুয়ে দিলেন সংগ্রামমুখর জাতীয় ইতিহাস. উদ্ভট উট এরশাদ এক্ষেত্রে সাফল্য পেয়েছেন.জয়নাল-দীপালীর রক্তের দাগ মুছে ফেলেছেন জাতির স্নৃতি থেকে, শফিক রেহমানের হাত ধরে গঙ্গায় ডুব দিয়ে নিজের শ্রীচরিত্রকে আরো পরিশুদ্ধ করেছেন, উপস্থাপন করেছেন একজন সংস্কৃতিমনা হিসেবে.বঙ্গজননীর আঁচল জেনারেল এরশাদের বুটের আঘাতে শত ছিন্ন হলেও লুটপাটের প্রশ্নে, ক্ষমতার গদিতে আরোহণের স্বার্থে আমাদের হাসিনা ও খালেদা মা কিন্তু ওই খচ্চরটাকে পালাক্রমে নিজেদের আঁচলের তলায় আশ্রয় দিয়েছেন.শফিক রেহমান এরশাদকে দিয়েছে ঢাল, খালেদা জিয়া শিরস্ত্রাণ, হাসিনা দান করেছেন বর্ম .আর আমরা আত্মবিস্মৃত, নির্লিপ্ত, নিবীর্যের মত হুজুগের কৃষ্ণগহবরে অর্পণ করেছি সংগ্রামী ঐতিহ্য, শৌর্য, বিবেক, চেতনা. এই যে কথিত ভ্যালেন্টাইন্স ডে, কি এর ইতিহাস? আমি গরু খোঁজার মত করে যা পেলাম তা হচ্ছে সম্পুর্ণ গাজাখুঁড়ি মার্কা, উদ্ভ্ট, ক্ষেত্রেবিশেষে বানোয়াট. একই দিবস অথচ ইতিহাস একাধিক তথ্য প্রদান করে যা স্রেফ ঠাকুরমার ঝুলির গল্পের মত.একটা ইতিহাস এরকম খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে রোমে এক ধরনের উৎসবের প্রচলন হয়. এ উৎসবে তরুণীরা স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে নাম লিখে বাক্সে জমা রাখত. এরপর রোমান যুবকেরা লটারির মাধ্যমে এক বছরের জন্য কোন তরুণীকে সংগী হিসেবে পেত.আবার বছর শেষে লটারি করা হত নতুন সঙ্গী নির্বাচনের জন্য. এ সংস্কৃতি প্রায় 800 বছর ধরে চলেছিল. কিন্তু কোথায়ও উল্লেখ করা হয়নি সঙ্গী নির্বাচনের কাল 14 ই ফেব্রুয়ারি.ক্যাথলিকদের মতবিরোধের কারণে এ ধারা পরিবর্তন করে নতুন ধারা পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়. তখন রোমানরা ভ্যালেন্টাইনকে হাজির করে. এ ভদ্রলোক নাকি প্রেমের জন্য আত্মবিসর্জন দিয়েছেন .তো তার আত্মত্যাগ কিরূপ? ২70 খ্রিস্টাব্দের রোম সম্রাট ক্লডিয়াস বিয়ের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন.ভ্যালেন্টাইন মহাশয় মানুষকে প্রেমে উৎসাহিত করতেন. সম্রাটের রোষানলে পড়ে বেচারার মাথা যায়. প্রাপ্ত তথ্য মতে ভ্যালেন্টাইনের শিরচ্ছেদের তারিখ ২4 ফেব্রুয়ারি 14 নয়.আবার বলা হয় ভ্যালেন্টাইন একজন সন্ত. সুদর্শন সন্ত ভ্যালেন্টাইনের রূপে মুগ্ধ রাণী ভ্যালেন্টাইনকে ভালোবেসে ফেলে.ভ্যালেন্টাইনের সাথে রাণীর পরকীয়া বিষয়টি আঁচ করতে পেরে ক্ষুদ্ধ রাজা অভাগা ভ্যালেন্টাইনের শিরচ্ছেদ করেন. এ সব তথাকথিত ভালোবাসা দিবসের ইতিহাস যে কতটুকু বানোয়াট, সামঞ্জস্যহীন, পৌরণিক কাহিনী অনুকরণে কাট পেস্ট করে মেরে দেওয়া তা আর বলার প্রয়োজন নেই.আরো একটু স্পষ্ট করে বললে বলতে হয় কর্পোরেটদের নগ্ন বাণিজ্যের বেশ্যাবৃত্তির প্রকৃষ্ট উদাহরণ এই ভালোবাসা দিবস. হলমার্কের মত বৃহৎ গিফট প্রতিষ্ঠানগুলো যখন পণ্য বিক্রয়ার্থে কাল্পনিক দিবস সৃষ্টি করে প্রচার যন্ত্র মারফত সমগ্র বিশ্বের তরুণ-তরুণীকে প্রেমের নামে স্থূল, উদযাপন সর্বস্বতার ঘোরটোপে বন্দী করে ফেলতে পারে তখন খানিকটা হলেও কর্পোরেটদের অপরিমেয় শক্তি সন্মন্ধে আঁচ করা যায়. পুঁজিবাদী সমাজের পণ্যায়নের অখন্ড বৃত্তের কেন্দ্রে ঘুরপাক খাচ্ছে আমাদের প্রেম, ভালোবাসা, মনুষ্যত্ব.বিশ্বায়নের নামে সংহার করে চলেছে অনুন্নত দেশের সংস্কৃতি.পয়দা করছে, আমদানি করছে এক উদ্ভট, বিকৃত ও ভোগবাদ সর্বস্ব জীবনাচারণ. প্রেম মানুষের সবচেয়ে সুকুমার ভাবাবেগ, উচ্চতর হৃদয়বৃত্তির বিকাশ যার বৈচিত্র্যময় শৈ্ল্পিক আত্মপ্রকাশ, বিকাশ ঘটে ষোড়শ শতকে বুর্জোয়া বিপ্লবের অব্যবহিত সময়গুলোতে. শেক্সপীয়রের অমর নাটক রোমিও-জুলিয়েটের ট্র্যাজিক পরিণতির মধ্যে ছিল সামন্তীয় সমাজ ভাঙ্গার আর্তনাদ, ছিল প্রতিবাদ সেই সমাজের বিরুদ্ধে যা মানুষের মানবিক বিকাশ রুদ্ধ করে দেয়.সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতার বাণী ধারণকারী বুর্জোয়া বিপ্লব মানুষের মুক্তির বারতা নিয়ে আবির্ভুত হয়েছিল. ঘটিয়েছিল মানুষের অনুভূতির নান্দনিক বিকাশ শিল্পে, সাহিত্যে, কাব্যে, সংগীতে, ভাস্কর্যে, চিত্রকলায়. কিন্তু ইতিহাসের আমোঘ নিয়মে সেই প্রগতিশীল সমাজ আজ অশ্লীল বেনিয়াবাদ তথা মুনাফাবৃত্তির জন্য সংহার করে চলেছে মানুষের প্রেম, মনুষ্যত্ব, চেতনা. কর্পোরেটওয়ালারা পণ্যের ক্ষণস্থায়িত্বের সাথে আমাদের মানবিক আবেগগুলো সঙ্গতিপুর্ণ করে ফেলেছে. স্থূল, দৈহিক কামনা তাড়িত, বর্তমান ভালোবাসায় নেই প্রকৃত সুকুমারবোধের নির্যাস.ভালোবাসা স্থানান্তরিত হয়েছে ফাস্টফুডের দোকানে, গিফটের প্যাকেটের ভেতর আর মোবাইল ফোন কোম্পানির হাতের মুঠোয়.আর তাই আজকের প্রেম ভালোবাসা উদযাপন সর্বস্ব, ক্ষণস্থায়ী, অনেকটা কর্পোরেটদের বানানো ভালোবাসা দিবসের কাহিনীর মত ঠিক যেভাবে রোমান তরুণ -তরুণীরা প্রত্যেক বছর সঙ্গী পরিবর্তন করত লটারির মাধ্যমে.অবাক হওয়ার কিছুই নেই যখন দেখা যায় বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া কোন অখ্যাত তরুণের কণ্ঠে ভেসে আসে "চলে গেছ তাতে কি / নতুন একটা পেয়েছি তোমার চেয়ে অনেক সুন্দরী .... আমাদের অনুভূতি ভোতা হয়ে গেছে কারণ রবীন্দ্রনাথের প্রেমের গান কিংবা জীবনান্দের কবিতা আজকাল্ আধুনিক প্রেমের হাটে বিকোয় না, তরুণদের ভালোবাসা জাগ্রত করে না, প্রবল উন্নাসিকতা থেকে একটিই আওয়াজ বের হয় "উফ শিট ম্যান, রবি ট্যাগর এ ব্যাকডেটেড গাই, জাস্ট ঘুম আনে আর কিচ্ছুই না". আজকাল পত্রিকাওয়ালা কিংবা টেলিভিশন মিডিয়া সোৎসাহে প্রেমের কনসাল্টেন্সি প্রদান করে, কাকে বেছে নেওয়া যায়, কিভাবে পটানো যায়, কিভাবে সতর্ক থাকা যায় প্রতারণার হাত থেকে. 14 ই ফেব্রুয়ারি দিনটিতে টেলিভিশন চ্যানেল গুলো চেঁচিয়ে মরবে আর পত্রিকাওয়ালাদের কলম ভাংবে ভালোবাসার জয়গান গাইতে গাইতে লিখতে লিখতে. কিন্তু এরা কেউ একবারো বলবে না আজ স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস, জয়নাল দীপালির রক্তে স্নাত, সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে শাণিত চেতনাবোধের প্রথম উজ্জীবন লগ্ন.বলতে দ্বিধা নেই আমাদের সংগ্রামী চেতনা ক্রমঅপসৃয়মান, জাগ্রত হওয়ার কোন স্পৃহা আমাদের মধ্যে কাজ করে না. জাগার কোন সুযোগ আছে কি? কারণ জাগরণের গানে পৃষ্টপোষকতা করে কর্পোরেটরা যার সতীর সতীত্ব বেশ্যার সুখ দুইই চায়. চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে, ক্ষয়িষ্ণু পুঁজিবাদ উৎসারিত বিকৃত, উদযাপন স্বর্বস্ব সংস্কৃতির নোংরা স্রোতে সংগ্রামী চেতনাকে নিমজ্জনের হাত থেকে কেউ কি রক্ষা করবে না? সেই স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে কেউ কি স্লোগান মুখর ঝাঁঝালো মিছিলে উচ্চারণ করবে না, "14 ই ফেব্রুয়ারি দিচ্ছে ডাক, স্বৈরাচার নিপাত যাক ".তবে কি কর্পোরেট সংস্কৃতির কাছে নতজানু, ম্রিয়মান হয়ে পড়বে আমাদের অনিরুদ্ধ সংগ্রামী তেজ, শৌর্য? কিন্তু এখনো হতাশ হই নি কিংবা হতাশ হতে চাই না .জানি, বিশ্বাস করি এ কথা মিথ্যা হতে পারে না যে ইতিহাস কথা কয়. ইতিহাস প্রেরণা নিয়ে হাজির হয়.ভুলিয়ে দেওয়ার, ভুলে যাওয়ার কোন অবকাশ নেই যখন দেখি সেনা সমর্থিত তত্বাবধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে ছাত্র জনতার বিক্ষোভ ফুঁসে ওঠে, শত দমন পীড়নের পরও নির্ভীক অপরাজেয় বাংলার ছাত্র সমাজ পর্বতের মত অবিচল থাকে তখন জয়নাল-মিলন-নূর হোসেন আবারো নজরুলের সেই দুরন্ত পথিকের মত হাজির হয়. জয়নালের উদ্দেশ্যে আমাদের তখন বলতে হয়- '' সহস্র প্রাণের উদ্বোধনই তো তোমার মরণের স্বার্থকতা '' তিউনিসিয়া থেকে মিশর, জর্ডান থেকে আলজেরিয়া যেখানেই সামরিক স্বৈরশাসন সেখানেই মৃত্যুঞ্জয়ী জয়নাল-বারুজিজদের আত্মা ঘুরে বেড়ায়. আর পালিয়ে বাঁচতে হয় এরশাদ, বেন আলী, হোসনে মোবারকদের. যুগে যুগে অনিবার, শতবার ...
আত্মবিস্মৃত জাতির চেতনার মর্মমূলে অনেকেই বারে বারে আঘাত হেনেছেন, জানি না কতটুকু সফল হয়েছেন, সফল হলে বোধ করি আমাকে লিখতে হত না. ইতিহাসের পাতা ওল্টাই.ফিরে যাই স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের সেই অগ্নিঝরা দিনগুলোতে. বিনা রক্তপাতে সামরিক অভ্যুথানের মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণকারী জেনারেল এরশাদের সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল বাংলার সংশপ্তক ছাত্রসমাজ.মজিদ খান প্রণীত বৈষম্যমূলক ও বাণিজ্যিকীকরণের শিক্ষানীতি প্রত্যাখ্যান করে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ধর্মঘট ও মিছিলের ডাক দেয়. সেই মিছিলে এরশাদের পেটোয়া পুলিশ বাহিনী হামলা চালায়. বেয়নট দিয়ে খুচিয়ে হত্যা করে ছাত্রনেতা জয়নালকে, গুলিতে নিহত হয় কাঞ্চন, প্রাণ হারায় দীপালি সাহা নামে এক অবুঝ শিশুর. সেই দিন এরশাদ নিজের অজান্তে বারুদে আগুন দিয়েছিল, আর সেই বিদ্রোহের আগুন দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়েছিল জাতির সমস্ত চেতনায়. জয়নাল-কাঞ্চনদের দেখানো পথে হেঁটেছিলেন নূর হোসেন, ডাঃ মিলন সহ নাম না জানা আরো অনেকে.আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় এরশাদ ক্ষমতাচ্যুত হয়, গণতন্ত্রের পতাকা শহীদের রক্তে স্নাত হয়ে আবার উড্ডীন হয়. স্বাধীনতা পরবর্তী এই বৃহৎ আন্দোলন সংগ্রামের উদবোধন লগ্ন ছিল ফেব্রুয়ারি মাসের একটা তারিখ. 14 ই ফেব্রুয়ারি.ছাত্রজনতার প্রথম প্রতিবা্দ, প্রথম বিক্ষোভে ফেটে পড়া, প্রথম আত্মদান, সামরিক বেষ্টনী থেকে গণতন্ত্রকে মুক্ত করার জন্য.কিন্তু হায়! বিশ্ববেহায়ার আরশ কাঁপানো সেই শহীদী আত্মদান ভ্যালেন্টাইন্স ডে "র আড়ালে চাপা পড়ে গেছে অনেকটা নিঃশব্দে.ধুর্ত শেয়াল এরশাদ অবৈধ ক্ষমতাকে জনগণের কাছে জায়েজ করার জন্য অনেক কুকর্ম করেছিলেন. যেমনি ভাবে ইসলামকে বানিয়েছিলেন রাষ্ট্রধর্ম. নিজের ললাট থেকে অমোচনীয় কলঙ্ক তিলক মুছে ফেলার জন্য সুযোগ খুঁজতে থাকা এরশাদের সাথে হাত মেলালেন বুদ্ধিজীবীর লেবাস ধারণকারী তারই মত আরো এক খচ্চর প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত নপুংসক শফিক রেহমান.রেহমান সাহেব আমদানি করলেন বিশ্ব ভালোবাসা দিবস.প্রেমের জোয়ারে ভাসিয়ে দিলেন বাংলার নগর-বন্দর, গ্রাম-গঞ্জ .ধুয়ে দিলেন সংগ্রামমুখর জাতীয় ইতিহাস. উদ্ভট উট এরশাদ এক্ষেত্রে সাফল্য পেয়েছেন.জয়নাল-দীপালীর রক্তের দাগ মুছে ফেলেছেন জাতির স্নৃতি থেকে, শফিক রেহমানের হাত ধরে গঙ্গায় ডুব দিয়ে নিজের শ্রীচরিত্রকে আরো পরিশুদ্ধ করেছেন, উপস্থাপন করেছেন একজন সংস্কৃতিমনা হিসেবে.বঙ্গজননীর আঁচল জেনারেল এরশাদের বুটের আঘাতে শত ছিন্ন হলেও লুটপাটের প্রশ্নে, ক্ষমতার গদিতে আরোহণের স্বার্থে আমাদের হাসিনা ও খালেদা মা কিন্তু ওই খচ্চরটাকে পালাক্রমে নিজেদের আঁচলের তলায় আশ্রয় দিয়েছেন.শফিক রেহমান এরশাদকে দিয়েছে ঢাল, খালেদা জিয়া শিরস্ত্রাণ, হাসিনা দান করেছেন বর্ম .আর আমরা আত্মবিস্মৃত, নির্লিপ্ত, নিবীর্যের মত হুজুগের কৃষ্ণগহবরে অর্পণ করেছি সংগ্রামী ঐতিহ্য, শৌর্য, বিবেক, চেতনা. এই যে কথিত ভ্যালেন্টাইন্স ডে, কি এর ইতিহাস? আমি গরু খোঁজার মত করে যা পেলাম তা হচ্ছে সম্পুর্ণ গাজাখুঁড়ি মার্কা, উদ্ভ্ট, ক্ষেত্রেবিশেষে বানোয়াট. একই দিবস অথচ ইতিহাস একাধিক তথ্য প্রদান করে যা স্রেফ ঠাকুরমার ঝুলির গল্পের মত.একটা ইতিহাস এরকম খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে রোমে এক ধরনের উৎসবের প্রচলন হয়. এ উৎসবে তরুণীরা স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে নাম লিখে বাক্সে জমা রাখত. এরপর রোমান যুবকেরা লটারির মাধ্যমে এক বছরের জন্য কোন তরুণীকে সংগী হিসেবে পেত.আবার বছর শেষে লটারি করা হত নতুন সঙ্গী নির্বাচনের জন্য. এ সংস্কৃতি প্রায় 800 বছর ধরে চলেছিল. কিন্তু কোথায়ও উল্লেখ করা হয়নি সঙ্গী নির্বাচনের কাল 14 ই ফেব্রুয়ারি.ক্যাথলিকদের মতবিরোধের কারণে এ ধারা পরিবর্তন করে নতুন ধারা পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়. তখন রোমানরা ভ্যালেন্টাইনকে হাজির করে. এ ভদ্রলোক নাকি প্রেমের জন্য আত্মবিসর্জন দিয়েছেন .তো তার আত্মত্যাগ কিরূপ? ২70 খ্রিস্টাব্দের রোম সম্রাট ক্লডিয়াস বিয়ের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন.ভ্যালেন্টাইন মহাশয় মানুষকে প্রেমে উৎসাহিত করতেন. সম্রাটের রোষানলে পড়ে বেচারার মাথা যায়. প্রাপ্ত তথ্য মতে ভ্যালেন্টাইনের শিরচ্ছেদের তারিখ ২4 ফেব্রুয়ারি 14 নয়.আবার বলা হয় ভ্যালেন্টাইন একজন সন্ত. সুদর্শন সন্ত ভ্যালেন্টাইনের রূপে মুগ্ধ রাণী ভ্যালেন্টাইনকে ভালোবেসে ফেলে.ভ্যালেন্টাইনের সাথে রাণীর পরকীয়া বিষয়টি আঁচ করতে পেরে ক্ষুদ্ধ রাজা অভাগা ভ্যালেন্টাইনের শিরচ্ছেদ করেন. এ সব তথাকথিত ভালোবাসা দিবসের ইতিহাস যে কতটুকু বানোয়াট, সামঞ্জস্যহীন, পৌরণিক কাহিনী অনুকরণে কাট পেস্ট করে মেরে দেওয়া তা আর বলার প্রয়োজন নেই.আরো একটু স্পষ্ট করে বললে বলতে হয় কর্পোরেটদের নগ্ন বাণিজ্যের বেশ্যাবৃত্তির প্রকৃষ্ট উদাহরণ এই ভালোবাসা দিবস. হলমার্কের মত বৃহৎ গিফট প্রতিষ্ঠানগুলো যখন পণ্য বিক্রয়ার্থে কাল্পনিক দিবস সৃষ্টি করে প্রচার যন্ত্র মারফত সমগ্র বিশ্বের তরুণ-তরুণীকে প্রেমের নামে স্থূল, উদযাপন সর্বস্বতার ঘোরটোপে বন্দী করে ফেলতে পারে তখন খানিকটা হলেও কর্পোরেটদের অপরিমেয় শক্তি সন্মন্ধে আঁচ করা যায়. পুঁজিবাদী সমাজের পণ্যায়নের অখন্ড বৃত্তের কেন্দ্রে ঘুরপাক খাচ্ছে আমাদের প্রেম, ভালোবাসা, মনুষ্যত্ব.বিশ্বায়নের নামে সংহার করে চলেছে অনুন্নত দেশের সংস্কৃতি.পয়দা করছে, আমদানি করছে এক উদ্ভট, বিকৃত ও ভোগবাদ সর্বস্ব জীবনাচারণ. প্রেম মানুষের সবচেয়ে সুকুমার ভাবাবেগ, উচ্চতর হৃদয়বৃত্তির বিকাশ যার বৈচিত্র্যময় শৈ্ল্পিক আত্মপ্রকাশ, বিকাশ ঘটে ষোড়শ শতকে বুর্জোয়া বিপ্লবের অব্যবহিত সময়গুলোতে. শেক্সপীয়রের অমর নাটক রোমিও-জুলিয়েটের ট্র্যাজিক পরিণতির মধ্যে ছিল সামন্তীয় সমাজ ভাঙ্গার আর্তনাদ, ছিল প্রতিবাদ সেই সমাজের বিরুদ্ধে যা মানুষের মানবিক বিকাশ রুদ্ধ করে দেয়.সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতার বাণী ধারণকারী বুর্জোয়া বিপ্লব মানুষের মুক্তির বারতা নিয়ে আবির্ভুত হয়েছিল. ঘটিয়েছিল মানুষের অনুভূতির নান্দনিক বিকাশ শিল্পে, সাহিত্যে, কাব্যে, সংগীতে, ভাস্কর্যে, চিত্রকলায়. কিন্তু ইতিহাসের আমোঘ নিয়মে সেই প্রগতিশীল সমাজ আজ অশ্লীল বেনিয়াবাদ তথা মুনাফাবৃত্তির জন্য সংহার করে চলেছে মানুষের প্রেম, মনুষ্যত্ব, চেতনা. কর্পোরেটওয়ালারা পণ্যের ক্ষণস্থায়িত্বের সাথে আমাদের মানবিক আবেগগুলো সঙ্গতিপুর্ণ করে ফেলেছে. স্থূল, দৈহিক কামনা তাড়িত, বর্তমান ভালোবাসায় নেই প্রকৃত সুকুমারবোধের নির্যাস.ভালোবাসা স্থানান্তরিত হয়েছে ফাস্টফুডের দোকানে, গিফটের প্যাকেটের ভেতর আর মোবাইল ফোন কোম্পানির হাতের মুঠোয়.আর তাই আজকের প্রেম ভালোবাসা উদযাপন সর্বস্ব, ক্ষণস্থায়ী, অনেকটা কর্পোরেটদের বানানো ভালোবাসা দিবসের কাহিনীর মত ঠিক যেভাবে রোমান তরুণ -তরুণীরা প্রত্যেক বছর সঙ্গী পরিবর্তন করত লটারির মাধ্যমে.অবাক হওয়ার কিছুই নেই যখন দেখা যায় বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া কোন অখ্যাত তরুণের কণ্ঠে ভেসে আসে "চলে গেছ তাতে কি / নতুন একটা পেয়েছি তোমার চেয়ে অনেক সুন্দরী .... আমাদের অনুভূতি ভোতা হয়ে গেছে কারণ রবীন্দ্রনাথের প্রেমের গান কিংবা জীবনান্দের কবিতা আজকাল্ আধুনিক প্রেমের হাটে বিকোয় না, তরুণদের ভালোবাসা জাগ্রত করে না, প্রবল উন্নাসিকতা থেকে একটিই আওয়াজ বের হয় "উফ শিট ম্যান, রবি ট্যাগর এ ব্যাকডেটেড গাই, জাস্ট ঘুম আনে আর কিচ্ছুই না". আজকাল পত্রিকাওয়ালা কিংবা টেলিভিশন মিডিয়া সোৎসাহে প্রেমের কনসাল্টেন্সি প্রদান করে, কাকে বেছে নেওয়া যায়, কিভাবে পটানো যায়, কিভাবে সতর্ক থাকা যায় প্রতারণার হাত থেকে. 14 ই ফেব্রুয়ারি দিনটিতে টেলিভিশন চ্যানেল গুলো চেঁচিয়ে মরবে আর পত্রিকাওয়ালাদের কলম ভাংবে ভালোবাসার জয়গান গাইতে গাইতে লিখতে লিখতে. কিন্তু এরা কেউ একবারো বলবে না আজ স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস, জয়নাল দীপালির রক্তে স্নাত, সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে শাণিত চেতনাবোধের প্রথম উজ্জীবন লগ্ন.বলতে দ্বিধা নেই আমাদের সংগ্রামী চেতনা ক্রমঅপসৃয়মান, জাগ্রত হওয়ার কোন স্পৃহা আমাদের মধ্যে কাজ করে না. জাগার কোন সুযোগ আছে কি? কারণ জাগরণের গানে পৃষ্টপোষকতা করে কর্পোরেটরা যার সতীর সতীত্ব বেশ্যার সুখ দুইই চায়. চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে, ক্ষয়িষ্ণু পুঁজিবাদ উৎসারিত বিকৃত, উদযাপন স্বর্বস্ব সংস্কৃতির নোংরা স্রোতে সংগ্রামী চেতনাকে নিমজ্জনের হাত থেকে কেউ কি রক্ষা করবে না? সেই স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে কেউ কি স্লোগান মুখর ঝাঁঝালো মিছিলে উচ্চারণ করবে না, "14 ই ফেব্রুয়ারি দিচ্ছে ডাক, স্বৈরাচার নিপাত যাক ".তবে কি কর্পোরেট সংস্কৃতির কাছে নতজানু, ম্রিয়মান হয়ে পড়বে আমাদের অনিরুদ্ধ সংগ্রামী তেজ, শৌর্য? কিন্তু এখনো হতাশ হই নি কিংবা হতাশ হতে চাই না .জানি, বিশ্বাস করি এ কথা মিথ্যা হতে পারে না যে ইতিহাস কথা কয়. ইতিহাস প্রেরণা নিয়ে হাজির হয়.ভুলিয়ে দেওয়ার, ভুলে যাওয়ার কোন অবকাশ নেই যখন দেখি সেনা সমর্থিত তত্বাবধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে ছাত্র জনতার বিক্ষোভ ফুঁসে ওঠে, শত দমন পীড়নের পরও নির্ভীক অপরাজেয় বাংলার ছাত্র সমাজ পর্বতের মত অবিচল থাকে তখন জয়নাল-মিলন-নূর হোসেন আবারো নজরুলের সেই দুরন্ত পথিকের মত হাজির হয়. জয়নালের উদ্দেশ্যে আমাদের তখন বলতে হয়- '' সহস্র প্রাণের উদ্বোধনই তো তোমার মরণের স্বার্থকতা '' তিউনিসিয়া থেকে মিশর, জর্ডান থেকে আলজেরিয়া যেখানেই সামরিক স্বৈরশাসন সেখানেই মৃত্যুঞ্জয়ী জয়নাল-বারুজিজদের আত্মা ঘুরে বেড়ায়. আর পালিয়ে বাঁচতে হয় এরশাদ, বেন আলী, হোসনে মোবারকদের. যুগে যুগে অনিবার, শতবার ...
.jpg)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন